ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘিরে নানা আলোচনা
- আপডেট সময় : ০৮:১৬:৪১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে ছোট প্রতিষ্ঠানের এ নির্বাচন সাত ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। গত সোমবার ঘোষিত নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘিরে ইসি ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে। কারণ এর মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছু জানে না।আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও আগের কমিশনগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ঘোষণা করত। যদিও কমিশন জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ভোটের তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।এমন পরিস্থিতিতে ২৩, ২৪ ও ২৫ তারিখে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত না হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল পর্যন্ত দলগুলোকে সংলাপের বিষয়ে কোনো চিঠি পাঠায়নি কমিশন। সবমিলিয়ে এ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
ইসির ঘোষিত প্রথম ধাপের নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপের ভোট গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ ২৭ মে।সূত্র জানায়, ইসির ঘোষিত দ্বিতীয় ধাপের সম্ভাব্য ভোটের তারিখ ১৩ ডিসেম্বর জুনিয়র বৃত্তির গণিত পরীক্ষা রয়েছে। আর তৃতীয় ধাপের সম্ভাব্য তারিখ ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর খালেদা জিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।
সোমবার এসব তারিখকে সম্ভাব্য উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছিলেন, ১৭ সেপ্টেম্বর (আগামীকাল বৃহস্পতিবার) আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে তারিখগুলো চূড়ান্ত করা হবে।
ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা নিয়ে সরকার ও ইসির বক্তব্যের বিষয়ে নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলিম বলেন, এটা অনাকাঙ্ক্ষিত, সমন্বয় থাকলেই ভালো হতো। ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে একটা ধারা (স্থানীয় সরকার নির্বাচন করবে ইসি) যুক্ত করা দরকার, যাতে এ রকম প্রশ্ন না ওঠে।
ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে গতকাল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও কিছু জানে না। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরকারের এ বিষয়ে কোনো চিঠি চালাচালি হয়নি। অন্য কোনো মাধ্যমেও আলোচনা হয়নি।
নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, তাদের নির্বাচন করার সাংবিধানিক ক্ষমতা আছে উল্লেখ করে তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর তারিখ ঘোষণা করে। প্রস্তুতি সভা বা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা করা হয়। এতে বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় থাকে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে, এটি নিশ্চিত। তবে নির্বাচন কবে এবং কী পদ্ধতিতে বা কোন পর্যায়ে হবে, তা নিয়ে কমিশনে গত দুদিন (রোববার ও সোমবার) ধরে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল (সোমবার) একটি টেন্টেটিভ (প্রাথমিক) সময়সূচি করা হয়েছে। সেখানে পাঁচটি ধাপে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি ধাপ রিজার্ভ রাখা হয়েছে। তবে এটি একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি।’
সচিব বলেন, আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বৈঠক হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ইনপুট নেওয়া হবে। এরপর এসব মতামতের ভিত্তিতে কমিশন নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করবে।
ভোটের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর প্রয়োজনীয় ইনপুট পাওয়ার ভিত্তিতে কমিশনই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবে।
সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, আলোচনা একটা চলমান প্রক্রিয়া। কার সঙ্গে কখন, কীভাবে আলোচনা হয়েছে, এ বিষয়ে এ মুহূর্তে বাড়তি কোনো মন্তব্য করতে রাজি নই।
এদিকে গতকাল সচিবালয়ে ইসির ঘোষিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সূচিসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক ও আইনগত এখতিয়ার অনুযায়ী কাজ করে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যে সম্ভাব্য সূচি প্রকাশ করেছে, তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিতব্য আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার মতামতের আলোকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে এবং সে পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত। অন্য নির্বাচনগুলো আইন অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয় রয়েছে।
তিনি বলেন, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী যেভাবে বলেছেন, সরকারের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে নির্বাচন কমিশন তাদের মতো করে তারিখ ঘোষণা করেছে; আমরা এ বক্তব্যটাকেই সঠিক ধরে নেব। এ নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সঙ্গে কোলাবরেট করেই এটা করতে হবে।
জাহেদ উর রহমান বলেন, এটাকে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো ‘গ্যাপ’ হিসেবে দেখার কারণ নেই। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া সময়সূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। প্রয়োজনে নির্বাচন আগে বা পরও হতে পারে।
সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সংসদ নির্বাচনের সাংবিধানিক অবস্থান এক নয়। সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব এখতিয়ার রয়েছে এবং সংবিধান অনুসরণ করে তারা নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয় রয়েছে।ইউপি নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন আইন ভঙ্গ করেছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি আইন ভঙ্গ করেছে, এভাবেও বলতে চাই না। আপনারা নির্বাচন কমিশনের কাছেও একটু ভেরিফাই করুন। তাদের বক্তব্য নিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
নির্বাচন নিয়ে অযথা সংঘাত বা বিভ্রান্তি তৈরির কিছু নেই—মন্তব্য করে তিনি বলেন, নির্বাচন হবেই এবং সরকার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করেই তা আয়োজন করবে।
ইসি সূত্র জানায়, গত রোববার ও সোমবার ইসির প্রাক-বৈঠকে সম্ভাব্য ভোটের তারিখ ঘোষণার আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শও দেওয়া হয়। তবে, শেষ পর্যন্ত ইসির পক্ষ থেকে আইন অনুযায়ী ভোটের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, ১৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করা হবে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হলে এক নির্বাচন কমিশনার বলেন, রেওয়াজ থাকলেও বিদ্যমান ইউপি নির্বাচনের আইন অনুযায়ী ভোটের তপশিল ঘোষণার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার কোনো বিধান নেই। আর আমরা সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছি, চূড়ান্ত করিনি। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সবার সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত তারিখ জানানো হবে।
সূত্র জানায়, ইউপি নির্বাচন আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী, কমিশন প্রণীত বিধি অনুসারে ইসি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্বাচন আয়োজন করবে। এক্ষেত্রে আইনের কোথাও সরকারের সঙ্গে আলোচনার কথা বলা নেই। তবে যেহেতু এসব নির্বাচনে সরকারের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, তাই রীতি অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।
ইউপি নির্বাচনে কমিশন যে কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে, তা চূড়ান্ত নয় বলে জানান নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সোমবার যে বিস্তারিত ব্রিফিং দেওয়া হয়েছে, তাতে বারবার বলা হয়েছে এটি চূড়ান্ত নয়, সম্ভাব্য তারিখ। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে বৃহস্পতিবার একটি সিদ্ধান্তে আসা যাবে।



















