বাণিজ্যে গতি আনতে দুই টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব
- আপডেট সময় : ০৯:২৩:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন এবং অবকাঠামো বিনিয়োগ ও অর্থায়ন নিয়ে দুটি যৌথ ব্যবসায়িক টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিআইআই)। একই সঙ্গে বেনাপোলসহ স্থলবন্দরগুলোতে পণ্য হ্যান্ডলিং আরও দ্রুত ও দক্ষ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন ভারতীয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। বেনাপোলসহ স্থলবন্দর দিয়ে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনে কিছু সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তারা।বিপরীতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে স্বাভাবিক বাণিজ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, ভিসা সহজ করা এবং বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।গতকাল মঙ্গলবার কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) প্রতিনিধিদলের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে এসব আলোচনা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সিআইআই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রতিষ্ঠানটির ডিরেক্টর জেনারেল চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি।
বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক, বিদ্যমান সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিনিধিদলে ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাদের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে এরই মধ্যে বিনিয়োগ রয়েছে।বৈঠকে ভৌগোলিক নৈকট্যকে অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আয়তন, জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকারে পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক বাস্তবতা পারস্পরিক সহযোগিতার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অবস্থান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনীতি বড় হলেও আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য তুলনামূলক কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো গেলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যকে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে।
বৈঠকে ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের ভিসা জটিলতা নিয়েও আলোচনা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা, ব্যবসা ও অন্যান্য প্রয়োজনে নিয়মিত যাতায়াতকারীদের জন্য কয়েক মাস পরপর নতুন ভিসার আবেদন বাস্তবসম্মত নয়। দীর্ঘমেয়াদি ভিসা ব্যবস্থার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সিআইআই প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের অবকাঠামো ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে দুটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে একটি অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) উন্নয়নে এবং অন্যটি সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, ব্যাটারি স্টোরেজ ও ডাটা সেন্টারের মতো ভবিষ্যৎমুখী শিল্পে সহযোগিতা বাড়াতে কাজ করবে।
সিআইআই জানায়, ভারতে গত বছর অবকাঠামো খাতে প্রায় ২৫ লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগ হয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। ভারতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে বলে মত দেন তারা।
বৈঠকে স্থানীয় উৎপাদনকারী শিল্পের সক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়বে।
এনার্জিপ্যাকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের উদাহরণ দিয়ে এক প্রতিনিধি বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়। স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আনতে ৪০-৪৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। স্থানীয় শিল্প পুনরুজ্জীবিত হলে এ সমস্যা অনেকাংশে কমবে।
এফএমসিজি খাতেও বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিআইআই। ঢাকার আশপাশে সাবান, হোম কেয়ার ইনসেক্টিসাইড, ফ্র্যাগ্রেন্সসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে একটি অত্যাধুনিক সমন্বিত কারখানা স্থাপনের আগ্রহের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
শিল্পে জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে শুল্ক কাঠামো সমন্বয়ের আহ্বানও জানানো হয়। সিআইআই প্রতিনিধিরা জানান, তাদের স্টিম-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহারে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক ও খাদ্য শিল্পে ১০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব। তবে শুল্ক বৈষম্যের কারণে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের তরুণদের ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের তৃতীয় দেশে কাজের ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতা নিরসনে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই।বৈঠকের পর বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থলবন্দর দিয়ে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনে কিছু সমস্যার কথা জানিয়েছে। বিশেষ করে বেনাপোলে কার্গো হ্যান্ডলিং আরও দক্ষ করা এবং সীমান্তে পণ্য চলাচল সহজ হলে তাদের পরিবহন ও কাঁচামালের ব্যয় কমবে। এতে দুই দেশের বাণিজ্যও বাড়বে।
সিআইআই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এফবিসিসিআইর বৈঠক: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে যৌথভাবে কাজ করতে দুটি বিজনেস-টু-বিজনেস (বিটুবি) টাস্কফোর্স গঠনের জন্য দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিকে (এফবিসিসিআই) প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই। অবকাঠামো এবং নতুন ও উদীয়মান প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প—এই দুই খাতকে টাস্কফোর্স দুটির আওতায় রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
গতকাল দুপুরে এফবিসিসিআইর মতিঝিল কার্যালয়ে আয়োজিত এক বৈঠকে এ প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশে সফররত সিআইআইর ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল। পরে বৈঠক শেষে এক যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানানো হয়।
ব্রিফিংয়ে চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি জানান, অবকাঠামো টাস্কফোর্সের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন। প্রতি প্রান্তিকে বাংলাদেশ ও ভারতে পালাক্রমে বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। আর দ্বিতীয় টাস্কফোর্সে সেমিকন্ডাক্টর, নিউক্লিয়ার পাওয়ার, হাইড্রোজেন-অ্যামোনিয়া, গ্রিন এনার্জি, ব্যাটারি স্টোরেজ, ডাটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সৌরশক্তিসহ বিভিন্ন ‘সানরাইজ সেক্টর’ নিয়ে কাজ হবে।
আরও জানানো হয়, টাস্কফোর্স দুটির বৈঠক প্রতি প্রান্তিকে বাংলাদেশ ও ভারতে পালাক্রমে আয়োজনের পরিকল্পনারও প্রস্তাবে রয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
ব্রিফিংয়ে এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো ফজলুল হক বলেন, সিআইআই প্রতিনিধিদল যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা যাবে। উল্লিখিত প্রস্তাবগুলো ছাড়াও বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিদ্যমান অশুল্ক বাধাসমূহ দূরীকরণের বিষয়েও আমাদের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিষয়কে পাশে সরিয়ে রেখে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা কীভাবে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যকে এগিয়ে নেব—সেটিই আমাদের উভয়পক্ষের মূল লক্ষ্য।
ব্রিফিংয়ের আগের বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী এবং এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু। দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করতে উভয়পক্ষের ব্যবসায়ী ও অংশীজনকে নিয়ে সমস্যার সমাধান খোঁজা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান, মীর নাসির হোসেন, মো. জসিম উদ্দিন, ডিসিসিআইর সভাপতি তাসকিন আহমেদ, ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান, বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল প্রমুখ।
দ্রব্যমূল্যে সন্তুষ্ট নন বাণিজ্যমন্ত্রী: দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পর বাজার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও দ্রব্যমূল্যে তিনি সন্তুষ্ট নন। তবে দাম কমানো শুধু বাজার তদারকির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য, ঋণের সুদ, উৎপাদনশীলতা, পরিবহন ও অবকাঠামোর মতো বিষয় জড়িত।
দ্রব্যমূল্য কমানোর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ফল আশা না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জ্বালানি সক্ষমতা তৈরিতে সময় লাগে। নতুন এলএনজি অবকাঠামো, গ্যাস সরবরাহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।



















