আগামীর বাংলাদেশ রচিত হবে প্রযুক্তি মেধার ভিত্তিতে
- আপডেট সময় : ০৮:৪০:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, আগামীর নতুন বাংলাদেশ রচিত হবে ‘প্রযুক্তি, মেধা ও অংশীদারত্ব—এই তিন মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিডার হলে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ-সিলিকন ভ্যালি প্রযুক্তি সংলাপ’-এ এমন প্রত্যয়ই ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নীতিনির্ধারক ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা।স্থানীয় সময় সোমবার সকালে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থিত বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সংলাপে সিলিকন ভ্যালির শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি গবেষক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং সফল প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঠানো একটি বিশেষ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এ সংলাপ দেশের প্রযুক্তি খাতকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে।সিলিকন ভ্যালিতে নীতিনির্ধারক ও প্রবাসীদের মিলনমেলা: অনুষ্ঠানের শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানান এবং পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিযুক্ত বাংলাদেশের উপহাইকমিশনার কাজী মোহাম্মদ জাবেদ ইকবাল। এ ছাড়া সংলাপে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম দুই দেশের কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রতিনিধিদলে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। নীতিনির্ধারকদের এ উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকার দেশের প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং মেধা পাচার রোধে প্রবাসী বিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ত করতে কতটা আন্তরিক।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে নতুন দিগন্ত: সংলাপের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সেমিকন্ডাক্টরের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। এ সময় বিশ্বের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশি গবেষকরা তাদের কি-নোট উপস্থাপনা করেন। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবান-শ্যাম্পেইনের সহকারী অধ্যাপক ড. শরিফা সুলতানা, উবারের ডিস্টিংগুইশড ইঞ্জিনিয়ার ড. মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম এবং এনভিডিয়ার গবেষক ড. মোস্তফা পাটোয়ারী বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের সমস্যা সমাধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রায়োগিক দিকগুলো তুলে ধরেন। এ ছাড়া গ্লোবালফাউন্ড্রিজের ড. মাহবুব রাশেদ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ও এর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেন।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ডেভিসের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং চেয়ার ড. সাইফ ইসলামের সঞ্চালনায় মেধা, প্রযুক্তি এবং পুঁজি শীর্ষক প্যানেল আলোচনাটি ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। প্যানেলে অংশ নেন বিশেষ সহকারী রেহান আসিফ আসাদ, ক্রেডো সেমিকন্ডাক্টরের ড. শাতিল হক, এক্সোর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. ইউসুফ হক, মেড্রনিকের সাবেক প্রধান নির্বাহী এবং ইন্টেলের বোর্ড অব ডিরেক্টরেটসের সাবেক চেয়ারম্যান ড. ওমর ইশরাক, উলকাসেমির সিইও মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান এবং ক্লাউডএইইর সিটিও বদরুল সরওয়ার। তারা গবেষণা, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন, শিল্প সংযোগ এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা বিনিয়োগ প্রাপ্তির নানাদিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
গবেষণা ও শিল্পের সংযোগে বিশেষ জোর: সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, শিক্ষা, গবেষণা, স্টার্টআপ এবং শিল্পের মধ্যে কার্যকর সেতু বন্ধন ছাড়া দেশের প্রযুক্তি খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘বায়ের’ শীর্ষ সম্মেলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো দেশের তরুণ প্রজন্মের অপ্রতিরোধ্য প্রযুক্তিগত মেধাকে যথাযথ সুযোগে রূপান্তর করা, যাতে দেশে উদ্ভাবন ও দক্ষ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশি প্রবাসীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কূটনীতি এখন আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।’ প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় জনশক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো মৌলিক জাতীয় চাহিদা মেটাতে এ প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে তিনি রূপরেখা তুলে ধরেন।
শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল দক্ষতা ও মৌলিক শিক্ষার মেলবন্ধন: প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ তার বক্তব্যে শিক্ষার ভিত মজবুত করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, শুধু উচ্চপ্রযুক্তির কথা বললেই চলবে না, পরিবর্তিত অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে শিশুদের প্রাথমিক স্তর থেকেই শক্তিশালী মৌলিক শিক্ষার পাশাপাশি ডিজিটাল দক্ষতার ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, শিক্ষকদের বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ এবং সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে মানসম্মত শিক্ষাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ওপর তিনি জোর দেন। জাতীয় পর্যায়ে কোনো বড় নীতি বাস্তবায়নের আগে পাইলট প্রজেক্ট বা পরীক্ষামূলক পদ্ধতির মাধ্যমে কার্যকারিতা যাচাই করার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
রাজস্ব নীতি ও জনকল্যাণমুখী প্রযুক্তির অঙ্গীকার: সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার উপযুক্ত রাজস্ব নীতি, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়গুলো মূল্যায়ন করছে।
প্রবাসী গবেষক ও বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে, যেখানে দুপক্ষেরই কার্যকর অংশীদারত্ব থাকবে। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, সব প্রযুক্তিগত সহযোগিতার চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে হবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং জনসেবার সংস্কার।









