ঢাকা ০২:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস ক্ষুণ্ন হচ্ছে শিক্ষকের মর্যাদা

  • আপডেট সময় : ০৭:৫৪:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

জ্ঞান, মুক্তবুদ্ধি ও নৈতিকতার শিক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকের। অথচ সেই দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে শিক্ষকদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় আধিপত্য বিস্তার, প্রতিপক্ষ শিক্ষককে চাপে রাখা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটিয়ে নানা অনিয়মে জড়ানোর অভিযোগ উঠছে একদল শিক্ষকের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক পরিচয়কে পুঁজি করে পদ-পদবি দখলের প্রতিযোগিতা, প্রশাসনিক পদে পছন্দের ব্যক্তিদের বসানো এবং ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এতে শিক্ষাঙ্গণে তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা, অন্যদিকে প্রশ্নের মুখে পড়ছে শিক্ষকতার মর্যাদা।সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শিক্ষকদের রাজনৈতিক সচেতনতা থাকা দোষের নয়। রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ বা বিশ্বাস করা একজন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের শামিল। এসব প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমছে শিক্ষার মান।এমন বাস্তবতায় আজ সোমবার দেশে বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এ উপলক্ষে সারা দেশের

১০১ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেবে সরকার। এর আগে সম্মাননা দেওয়া হতো ১২ জনকে। এবার সেই সংখ্যা বাড়ল কয়েকগুণ।জাতি গঠনে শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ২ লাখ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হবে। এদিন দুপুরে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে গুণী শিক্ষকদের হাতে এই সম্মাননা তুলে দেবেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সভাপতিত্ব করবেন।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন ও বিরোধ দীর্ঘদিনের। গত কয়েক দশক থেকেই শিক্ষা প্রশাসনের পদধারীদের নিয়োগ, শিক্ষক সংগঠনের নির্বাচন, শিক্ষকদের পদায়ন, দায়িত্ব বণ্টন- এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদনও হচ্ছে দলীয় দৃষ্টি কোনে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন ও বিরোধের অভিযোগ সামনে আসছে। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষকদের একটি অংশ। ফলে শিক্ষার পরিবেশের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা—সবখানেই রয়েছে দলীয়করণের কালো ছায়া। কারণ সবজায়গায়ই একজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার সময়-পুলিশ ভ্যারিফিকেশনের নামে তার রাজনৈতিক আদর্শ যাচাই করা হয়। ফলে শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই তিনি শিক্ষকতায় আসতে পারেন না। সর্বশেষ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগেই প্রায় দুই সহস্রাধিক চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষককে নিয়োগপত্র না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। পরে সারা দেশে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বাকিদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। পদায়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক কিংবা সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকার দলীয় অধিকাংশ লোকেরা ভালো জায়গায় পদায়ন পান। এসব প্রশাসনের নেতৃত্বে আসেন দলীয় অনুগত লোকেরা।

সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এসব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পান বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা।

শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ক্যাডারদের সংগঠন মূলত দুভাগে বিভক্ত। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন ওই ক্যাডারের লোকজন ভালো জায়গায় পদায়ন পান। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় মেধার ভিত্তিতে নয় বরং দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। যেমন—এ সরকার ক্ষমতায় এসে আগের সরকারের অনুসারীদের বাদ দিয়ে তাদের লোকজনকে নিয়ে এসেছে। অবশ্য শিক্ষকদের অতিমাত্রায় রাজনীতিতে জড়িয়েপড়া ঠেকাতে এবার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য নতুন আচরণবিধি করা হচ্ছে। তাতে শিক্ষকদের রাজনীতিতে জড়ানোর সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে। বিষয়টি অবগত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতিতে জড়ানো ঠেকাতে আচরণবিধি করার নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা মেনে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আচরণবিধি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া পরিমার্জন করে চূড়ান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফল খারাপ হওয়ার জন্য শিক্ষকরা তাদের দায় এড়াতে পারেন না। বিগত দিনে দেখা গেছে, শিক্ষকরা ক্লাসরুমে পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগী হয়েছেন বেশি। ফলে সার্বিক ফলাফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শিক্ষাঙ্গণে শিক্ষকদের রাজনীতিমুক্ত রাখা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার এখন সময়ের দাবি।বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও দলীয়করণের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদে নিয়োগ হয় দলীয় আদর্শ দেখে। দীর্ঘদিন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক রাজনৈতিক বলয়। পাশাপাশি এসব বলয়ের প্রভাব শিক্ষক সংগঠনের নির্বাচন, রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন, বিভিন্ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টনেও প্রভাব রাখে। রাজনৈতিক পরিচয় ও আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বলে অভিযোগ অনেকের। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তদারকি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সদস্যও নিয়োগ হয় দলীয় পরিচয়ে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক এই প্রতিহিংসা সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর। সেই সময় একদল শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের ‘মব’ বা আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের পদধারী কিংবা সমর্থক শিক্ষকদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। কোনো কোনো শিক্ষককে আবার প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষই সাময়িক ও স্থায়ী অব্যাহতি দেয়। দুর্নীতি কিংবা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে—এমন কিছু শিক্ষককেও পদত্যাগ করানো হয়। অনেক জায়গায় হেনস্তার মুখোমুখি হন শিক্ষকরা। কোথাও কোথাও শিক্ষকদের মারধর করে ক্যাম্পাস থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত ছয়জন শিক্ষকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আরও চার শতাধিক শিক্ষক বিষয়টি মানসিকভাবে মেনে নিতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক শিক্ষক আছেন, যারা পদত্যাগ না করলেও আন্দোলনকারীদের তোপের মুখে পড়ার আশঙ্কায় এখন পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত রয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কয়েক মাসে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ঠিক কতজন শিক্ষককে মবের শিকার হয়ে পদত্যাগ, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই শিক্ষা প্রশাসনের কাছে। তবে ভুক্তভোগী শিক্ষক, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, প্রায় ছয় হাজার শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগ ও বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষক আদালতের রায়, স্থানীয় সমঝোতা কিংবা প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে কাজে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এখনো সাড়ে তিন হাজারের বেশি শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাইরে রয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা ‘সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত, এমন আখ্যা দিয়ে ক্লাস থেকে বিরত কিংবা সাময়িক বরখাস্ত করা হচ্ছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, ‘এটা তো নতুন সমস্যা না। এখানে শিক্ষকদের দায়িত্ব যেমন আছে, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব আরও বেশি। তারা এটাকে উৎসাহিত করেন। রাজনৈতিক নেতারা চান, শিক্ষকরা দলাদলি করুক। এতে তাদের সুবিধা আদায় করা সম্ভব। শিক্ষাকে দলীয় রাজনীতি থেকে একটু দূরে রাখার চেষ্টা কেউ করেন না। আর আমাদের দেশে নানা রকম শিক্ষক সংগঠন আছে। সংগঠনগুলো নিয়ে আলোচনা দরকার। এগুলো কীভাবে গঠিত হবে, কারা নিয়ন্ত্রণ করবে, কারা সত্যি সত্যি শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব করবে। আবার সরকারের একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে দলীয় সম্পর্ক থাকবে না। শিক্ষক সংগঠনগুলো শুধু প্রফেশনালভাবে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা, নিজেদের মর্যাদা রক্ষা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যেটা দেখতে পাচ্ছি, কোনো যোগ্যতা-দক্ষতা নয়, দলীয় বিবেচনাটাই প্রধান। এজন্যই প্রতিষ্ঠানগুলোয় এত অসন্তোষ। শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। শিক্ষকরা এবং প্রশাসনিক পদে যাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তারা সবার প্রত্যাশা পূরণ করে কাজ করতে পারছেন না। এতে সরকারের কী লাভ হচ্ছে? এ ধারা ও সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস ক্ষুণ্ন হচ্ছে শিক্ষকের মর্যাদা

আপডেট সময় : ০৭:৫৪:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

জ্ঞান, মুক্তবুদ্ধি ও নৈতিকতার শিক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকের। অথচ সেই দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে শিক্ষকদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় আধিপত্য বিস্তার, প্রতিপক্ষ শিক্ষককে চাপে রাখা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটিয়ে নানা অনিয়মে জড়ানোর অভিযোগ উঠছে একদল শিক্ষকের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক পরিচয়কে পুঁজি করে পদ-পদবি দখলের প্রতিযোগিতা, প্রশাসনিক পদে পছন্দের ব্যক্তিদের বসানো এবং ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এতে শিক্ষাঙ্গণে তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা, অন্যদিকে প্রশ্নের মুখে পড়ছে শিক্ষকতার মর্যাদা।সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শিক্ষকদের রাজনৈতিক সচেতনতা থাকা দোষের নয়। রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ বা বিশ্বাস করা একজন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের শামিল। এসব প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমছে শিক্ষার মান।এমন বাস্তবতায় আজ সোমবার দেশে বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এ উপলক্ষে সারা দেশের

১০১ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেবে সরকার। এর আগে সম্মাননা দেওয়া হতো ১২ জনকে। এবার সেই সংখ্যা বাড়ল কয়েকগুণ।জাতি গঠনে শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ২ লাখ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হবে। এদিন দুপুরে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে গুণী শিক্ষকদের হাতে এই সম্মাননা তুলে দেবেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সভাপতিত্ব করবেন।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন ও বিরোধ দীর্ঘদিনের। গত কয়েক দশক থেকেই শিক্ষা প্রশাসনের পদধারীদের নিয়োগ, শিক্ষক সংগঠনের নির্বাচন, শিক্ষকদের পদায়ন, দায়িত্ব বণ্টন- এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদনও হচ্ছে দলীয় দৃষ্টি কোনে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন ও বিরোধের অভিযোগ সামনে আসছে। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষকদের একটি অংশ। ফলে শিক্ষার পরিবেশের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা—সবখানেই রয়েছে দলীয়করণের কালো ছায়া। কারণ সবজায়গায়ই একজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার সময়-পুলিশ ভ্যারিফিকেশনের নামে তার রাজনৈতিক আদর্শ যাচাই করা হয়। ফলে শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই তিনি শিক্ষকতায় আসতে পারেন না। সর্বশেষ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগেই প্রায় দুই সহস্রাধিক চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষককে নিয়োগপত্র না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। পরে সারা দেশে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বাকিদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। পদায়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক কিংবা সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকার দলীয় অধিকাংশ লোকেরা ভালো জায়গায় পদায়ন পান। এসব প্রশাসনের নেতৃত্বে আসেন দলীয় অনুগত লোকেরা।

সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এসব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পান বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা।

শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ক্যাডারদের সংগঠন মূলত দুভাগে বিভক্ত। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন ওই ক্যাডারের লোকজন ভালো জায়গায় পদায়ন পান। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় মেধার ভিত্তিতে নয় বরং দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। যেমন—এ সরকার ক্ষমতায় এসে আগের সরকারের অনুসারীদের বাদ দিয়ে তাদের লোকজনকে নিয়ে এসেছে। অবশ্য শিক্ষকদের অতিমাত্রায় রাজনীতিতে জড়িয়েপড়া ঠেকাতে এবার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য নতুন আচরণবিধি করা হচ্ছে। তাতে শিক্ষকদের রাজনীতিতে জড়ানোর সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে। বিষয়টি অবগত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতিতে জড়ানো ঠেকাতে আচরণবিধি করার নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা মেনে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আচরণবিধি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া পরিমার্জন করে চূড়ান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফল খারাপ হওয়ার জন্য শিক্ষকরা তাদের দায় এড়াতে পারেন না। বিগত দিনে দেখা গেছে, শিক্ষকরা ক্লাসরুমে পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগী হয়েছেন বেশি। ফলে সার্বিক ফলাফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শিক্ষাঙ্গণে শিক্ষকদের রাজনীতিমুক্ত রাখা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার এখন সময়ের দাবি।বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও দলীয়করণের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদে নিয়োগ হয় দলীয় আদর্শ দেখে। দীর্ঘদিন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক রাজনৈতিক বলয়। পাশাপাশি এসব বলয়ের প্রভাব শিক্ষক সংগঠনের নির্বাচন, রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন, বিভিন্ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টনেও প্রভাব রাখে। রাজনৈতিক পরিচয় ও আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বলে অভিযোগ অনেকের। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তদারকি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সদস্যও নিয়োগ হয় দলীয় পরিচয়ে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক এই প্রতিহিংসা সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর। সেই সময় একদল শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের ‘মব’ বা আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের পদধারী কিংবা সমর্থক শিক্ষকদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। কোনো কোনো শিক্ষককে আবার প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষই সাময়িক ও স্থায়ী অব্যাহতি দেয়। দুর্নীতি কিংবা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে—এমন কিছু শিক্ষককেও পদত্যাগ করানো হয়। অনেক জায়গায় হেনস্তার মুখোমুখি হন শিক্ষকরা। কোথাও কোথাও শিক্ষকদের মারধর করে ক্যাম্পাস থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত ছয়জন শিক্ষকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আরও চার শতাধিক শিক্ষক বিষয়টি মানসিকভাবে মেনে নিতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক শিক্ষক আছেন, যারা পদত্যাগ না করলেও আন্দোলনকারীদের তোপের মুখে পড়ার আশঙ্কায় এখন পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত রয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কয়েক মাসে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ঠিক কতজন শিক্ষককে মবের শিকার হয়ে পদত্যাগ, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই শিক্ষা প্রশাসনের কাছে। তবে ভুক্তভোগী শিক্ষক, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, প্রায় ছয় হাজার শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগ ও বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষক আদালতের রায়, স্থানীয় সমঝোতা কিংবা প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে কাজে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এখনো সাড়ে তিন হাজারের বেশি শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাইরে রয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা ‘সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত, এমন আখ্যা দিয়ে ক্লাস থেকে বিরত কিংবা সাময়িক বরখাস্ত করা হচ্ছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, ‘এটা তো নতুন সমস্যা না। এখানে শিক্ষকদের দায়িত্ব যেমন আছে, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব আরও বেশি। তারা এটাকে উৎসাহিত করেন। রাজনৈতিক নেতারা চান, শিক্ষকরা দলাদলি করুক। এতে তাদের সুবিধা আদায় করা সম্ভব। শিক্ষাকে দলীয় রাজনীতি থেকে একটু দূরে রাখার চেষ্টা কেউ করেন না। আর আমাদের দেশে নানা রকম শিক্ষক সংগঠন আছে। সংগঠনগুলো নিয়ে আলোচনা দরকার। এগুলো কীভাবে গঠিত হবে, কারা নিয়ন্ত্রণ করবে, কারা সত্যি সত্যি শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব করবে। আবার সরকারের একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে দলীয় সম্পর্ক থাকবে না। শিক্ষক সংগঠনগুলো শুধু প্রফেশনালভাবে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা, নিজেদের মর্যাদা রক্ষা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যেটা দেখতে পাচ্ছি, কোনো যোগ্যতা-দক্ষতা নয়, দলীয় বিবেচনাটাই প্রধান। এজন্যই প্রতিষ্ঠানগুলোয় এত অসন্তোষ। শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। শিক্ষকরা এবং প্রশাসনিক পদে যাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তারা সবার প্রত্যাশা পূরণ করে কাজ করতে পারছেন না। এতে সরকারের কী লাভ হচ্ছে? এ ধারা ও সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।