দুশ্চিন্তা তাড়া করছে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক তকমার ভয়
- আপডেট সময় : ০৫:১৬:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আর মাত্র কয়েক দিন পরই। একই দিনে হবে জুলাই সনদ ইস্যুতে গণভোট। শেষ মুহূর্তে এসে এই দুই ভোটের ফল নিয়ে দুশ্চিন্তায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা, পাশাপাশি নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তারাও রয়েছেন নিজেদের পেশাগত ভাবমূর্তিতে কোনো দাগ না লাগিয়ে বিতর্কমুক্তভাবে সবকিছু সম্পন্নের প্রচেষ্টায়। যদিও ভোট কারচুপির অভিযোগ এবারের নির্বাচনেও পিছু ছাড়বে না—এমন আশঙ্কা তাড়া করে ফিরছে তাদের। এ ছাড়া কখন কোন অভিযোগে বদলি কিংবা ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হতে হয়, রয়েছে এমন ভয়ও। সবমিলিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দিনভর ভোটগ্রহণ এবং তারপর ফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তাদের মধ্যে ভর করা অজানা শঙ্কা কাটছে না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মাঠ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এমনই চিত্র।
সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট গ্রহণ সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অধীনে পাতানো তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০১৪ সালের ভোটে দায়িত্ব পালনকারী অনেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং পুলিশ সুপারকে (এসপি) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ২০১৮ সালের ভোটে দায়িত্বপালনকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ডিসিদের ওএসডি করা হয়। তারা কর্মজীবনে আদৌ ফিরতে পারবেন কি না, সেটি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। এসব কর্মকর্তার পদোন্নতিও মেলেনি। কেউ কেউ বলছেন, ২০১৮-এর নির্বাচন পরিচালনাকারী ডিসিদের চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেবে সরকার। এসব কর্মকর্তাকে শাস্তির আওতায় আনার ফলে এবারের নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা অনেক বেশি সতর্ক। তারা দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করা থেকে এখন পর্যন্ত বিরত রয়েছেন। যদিও মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের ধাপে অনেক ডিসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছিল। তখন সরকারের তরফ থেকে তাদের সতর্ক করা হয়। ফলে তারা নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করছেন। তবে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে কর্মকর্তারা ফেঁসে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে তাদের মধ্যে এক ধরনের দুশ্চিন্তা কাজ করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘নির্বাচনে নিরপেক্ষ থাকার জন্য আমাদের বারবার বলা হচ্ছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও বারবার এ ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। বারবার সরকারের তরফ থেকে নির্দেশনা দেওয়ার ফলে তাদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ, ভোটে অনিয়ম হলে তাদের দায় নিতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকার পাশের একটি বড় জেলার ডিসি কালবেলাকে বলেন, ‘ভোটে নানা হিসাব-নিকাশ আছে। প্রার্থীরা সবাই চান আমরা যেন তাদের পক্ষে থাকি। এটা তো সম্ভব নয়। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে। ফলে ভোটের ফল যাদের বিপক্ষে যাবে, তারা আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবে। এটা পুরোনো সংস্কৃতি। এজন্য বাড়তি দুশ্চিন্তা আছে।’ও এসিল্যান্ডদের ওপর নানা অভিযোগ চাপিয়ে দিচ্ছেন প্রার্থীরা। গত কয়েকদিন আগে দেশের বেশ কয়েকটি উপজেলার ইউএনওকে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে আবার সেই বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। প্রার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতেই তাদের বদলি করা হয়েছিল। পরে আবার অন্য প্রার্থীদের অনুরোধে ওই আট ইউএনওর বদলি আদেশ স্থগিত করা হয় বলে জানা গেছে। এ নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারাও দুই ভাগে বিভক্ত হন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
শুধু ইসিতে নয়, সাংবাদিকদের কাছে কর্মকর্তাদের নামে অভিযোগ দিচ্ছেন প্রার্থীরা। এই প্রতিবেদকের কাছে অনেক কর্মকর্তার নামে অভিযোগ এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের অনুরোধও করেছেন কোনো কোনো প্রার্থী।
একাধিক ইউএনও কালবেলাকে জানান, প্রার্থীরা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাদের কাছে অভিযোগ দিচ্ছেন। এসব অভিযোগ সমাধান করতে হচ্ছে। আসলে ভোটের মাঠে কাউকে সন্তুষ্ট রাখা খুবই কঠিন কাজ। সন্তুষ্ট না হলে তাদের কেউ কেউ নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দিচ্ছেন। এটা কর্মকর্তাদের জন্য চিন্তার কারণ।
তারা আরও বলেন, প্রভাবশালী প্রার্থীদের নেতাকর্মীদের তোপের মুখেও অনেক সময় পড়তে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা আইন অনুযায়ী সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেও জানান।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী কালবেলাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ জন ইউএনও-এসিল্যান্ডের নামে অভিযোগ এসেছে। ইসি থেকে আমাদের কাছে এসেছে। আমরা এগুলো বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমে তদন্ত করে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেব।’
কর্মকর্তাদের অভয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢালাও কেউ অভিযোগ দিলেই কোনো অফিসারকে বদলি কিংবা ওএসডি করার সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত কারও তদবিরে অন্যায়ভাবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে না। এবারের ভোট যেন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকে আমরা সেই পথে হাঁটছি। সুতরাং কর্মকর্তারা চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই বলেও মনে করেন আশরাফ রেজা ফরিদী।’











