স্টারলিংক নিয়ে ভারতে বিতর্ক, নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা
- আপডেট সময় : ০৮:২৬:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালু করা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্টারলিংক। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ভারতের কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে চায় তারা।তবে ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআই নিউজ জানায়, দিল্লিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা কূটনীতি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টারলিংক শুধু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করতে পারে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকলে ভারতের তথ্যের নিরাপত্তা ও নিজস্ব প্রযুক্তি খাত ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে এসব অভিযোগ গবেষণা সংস্থাটির নিজস্ব বিশ্লেষণ। স্টারলিংক এসব অভিযোগের বিষয়ে কী বলেছে, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের অভিযোগ, স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে ভারতে স্টারলিংকের লাইসেন্স আটকে রাখা হচ্ছে। তবে ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় তার এ দাবি নাকচ করেছে।কূটনীতি ফাউন্ডেশনের ‘ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ভূমিকা মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, স্টারলিংক নিজেকে প্রত্যন্ত ও ইন্টারনেট সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় সংযোগ পৌঁছে দেওয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু এর প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও সামরিক কার্যক্রমেও ব্যবহার করা যেতে পারে।প্রতিবেদনটির মূল বক্তব্য হলো, কোনো যোগাযোগ নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকলে সেটি ব্যবহার করে তথ্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে চাইলে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা এলাকার জন্য সেবা বন্ধও করে দেওয়া যায়। গবেষকদের মতে, স্টারলিংকের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর, মহাকাশ বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে স্টারলিংকের চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এ প্রযুক্তি বেসামরিক কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি সামরিক অভিযানেও কাজে লাগানো সম্ভব।এর মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ, ক্ষেপণাস্ত্রের গতিবিধি অনুসরণ এবং চলমান লক্ষ্যবস্তু নজরদারির সক্ষমতা বাড়তে পারে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে কোনো এলাকায় স্টারলিংকের সেবা চালু বা বন্ধ করার ঝুঁকি রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। গবেষকদের ভাষায়, সেবা বন্ধ করে দেওয়ার এই ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর চাপ তৈরির হাতিয়ার হতে পারে।প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশে লাইসেন্স ও স্থানীয় আইন মেনে চলা নিয়েও স্টারলিংকের সমালোচনা করা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, কোনো কোনো দেশে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার আগেই প্রতিষ্ঠানটি সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্রাজিলের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে একটি আইনি বিরোধের জেরে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ ফেডারেল আদালত স্টারলিংকের আর্থিক সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে সেই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
গবেষণাপত্রে ভারতের জন্যও ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। লেখকদের মতে, স্টারলিংকের মতো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে স্যাটেলাইট যোগাযোগের নিয়ন্ত্রণ থাকলে ভারতের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতির আকার প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতিতে দেশটির অংশ ২ থেকে ৩ শতাংশ। আগামী ১০ বছরে এই খাতের আকার বেড়ে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতিতে ভারতের অংশ ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।গত ১২ বছরে মহাকাশ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়াতে বিভিন্ন সংস্কার করেছে ভারত সরকার। গবেষকদের আশঙ্কা, বিদেশি স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশটির নিজস্ব মহাকাশ প্রযুক্তি খাতের বিকাশে বাধা তৈরি করতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বিদেশি স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠোর লাইসেন্সের শর্ত চালুর সুপারিশ করেছে কূটনীতি ফাউন্ডেশন। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ভারতের ইন্টারনেট ও যোগাযোগের তথ্য দেশের ভেতরের নির্ধারিত কেন্দ্রের মাধ্যমে আদান-প্রদান করতে হবে। স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি অন্য স্যাটেলাইটে তথ্য পাঠিয়ে এসব কেন্দ্র এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না।
এ ছাড়া ভারতে সেবা চালু বা বন্ধ করার ক্ষমতা দেশটির কর্তৃপক্ষের হাতে রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রয়োজনে এই ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়টি যাচাই করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। যোগাযোগে আইন অনুযায়ী আড়ি পাতা এবং দেশের ভেতরে তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ভারতের আইন মানতে হবে।তবে স্টারলিংক জানিয়েছে, ভারতীয় বাজারের জন্য তারা বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করেছে। গত ৭ অক্টোবর ভারতের মোবাইল কংগ্রেস ২০২৬-এ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ভাইস প্রেসিডেন্ট লরেন ড্রেয়ার বলেন, ভারতীয় ব্যবহারকারীদের তথ্য দেশটির ভেতরেই রাখা হচ্ছে।
ড্রেয়ার আরো জানান, ভারতে সেবা চালুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্টারলিংক শত শত অ্যানটেনাসহ ২০টি গেটওয়ে কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এসব অবকাঠামো তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগও করেছে। বাংলাদেশ ও ভুটানসহ বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশে স্টারলিংকের সেবা চালু রয়েছে। শিগগিরই শ্রীলঙ্কাতেও সেবাটি চালুর কথা রয়েছে।ভারত সরকার জানিয়েছে, স্যাটেলাইট যোগাযোগ খাতে কোনো প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে না। এ খাতে প্রতিযোগিতায় থাকা তিনটি প্রতিষ্ঠানই নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করলে লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
























